Science and Tech

THE LAST INVENTION OF MANKIND

Rowshan Taieen rowshantaieen 1 min read Science and Tech

আমরা কি নিজেদের উত্তরসূরি নিজেরাই বানিয়ে ফেলছি?

রাত তিনটা ঘড়িতে।  কোথাও হয়তো কাসাব্লাঙ্কার কোনো পুরানো ঘরে, অথবা হয়তো সাংহাইয়ের কিংবা ব্যাঙ্গালোরের — একজন ক্লান্ত ইঞ্জিনিয়ার মনিটরের উজ্জ্বল আলোর সামনে বসে কোডিং করছেন।  তিনি হয়তো জানেনই না, যে কোডের লাইনটা তিনি লিখছেন, এই লাইনটা তাঁর নিজের এবং একই সঙ্গে তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎকে লিখে দিচ্ছে।

প্রায় শতবর্ষ যাবত একটা চিন্তা বিজ্ঞানীদের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে আছে। না। কোন যুদ্ধের চিন্তা  না, মহামারীর না। অন্যকিছু। পৃথিবীর কোথাও, কোন পাহাড়ের নিচে বরফ ঢাকা আচ্ছাদনে মিট মিট করা এলইডি লাইটের আলোয় আলোকিত একটা সার্ভারে, যেখানে আলো কোনোদিন নেভে না এমন একটা ল্যাবরেটরিতে;  মানুষ হয়তো তার জীবনের শেষ আবিষ্কারটা করে ফেলেছে।

এটা কোনো অস্ত্র না। এটাকে একটা উত্তরসূরি বলা যায় ।

আর সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় হলো,  এই মুহূর্তটা যখন ঘটবে বা ঘটে গেছে , আমরা টেরও পাইনি  বা পাবো না।

— — —

ত্রিশ লক্ষ বছর আগে, ইথিওপিয়ার শুকনো প্রান্তরে, কেউ একজন দুটো পাথর ঠুকেছিল। একটা টুকরো ছিটকে পড়ল। আরেকটা পাথরের ধার ধারালো হয়ে গেল। সেই মুহূর্তে তাঁর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।  এমন কিছু সে কল্পনা করলো যা তখনও অস্তিত্বে আসেনি। 

মানুষের প্রতিটা আবিষ্কারই ছিল নিজের একটা সম্প্রসারণ। হাতের কুঠারে  বাড়ল মুষ্টির শক্তি। চাকায় বাড়লো পায়ের গতি। দূরবিনে চোখের সীমা। কিন্তু এখন যা তৈরি হচ্ছে, সেটা একদম আলাদা। 

এবার মনকেই বাড়ানো হচ্ছে। আর একবার মন যখন নিজের দেহ ছাড়িয়ে যায় — সে তাকে জন্ম দেওয়া শরীরটাকে আর দরকার মনে করে না।

— — —

২০১২ সালে কানাডার একদল গবেষক এমন একটি কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করেছিলেন, যা ছবি চিনতে আগের সব প্রযুক্তিকে অনেক পেছনে ফেলে দেয়। “AlexNet” নামের এই সিস্টেমটি ImageNet প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে আগের সেরা সিস্টেমের প্রায় ২৫% ভুলের হার এক লাফে ১৫%–এর কাছাকাছি নামিয়ে আনে। এত বড় উন্নতি দেখে প্রযুক্তি দুনিয়া স্তব্ধ হয়ে যায়, কারণ এর আগে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি হচ্ছিল খুব ধীরে। কয়েক মাসের মধ্যে পৃথিবীর প্রতিটা বড় প্রযুক্তি কোম্পানি এমন যে কাউকে চাকরি দিচ্ছিল, যে শুধু “নিউরাল” শব্দটা বানান করতে পারে। সত্তর বছরের AI Winter বা AI–এর স্থবিরতার যুগ শেষ হয় অবশেষে।  সেখান থেকেই আধুনিক AI বিপ্লবের সূচনা হয়।

২০১৬ সালে AlphaGo বিশ্বের অন্যতম সেরা গো খেলোয়াড় Lee Sedol এর বিরুদ্ধে খেলতে নেমে সবাইকে অবাক করে দেয়। খেলার ৩৭ নম্বর চালে AlphaGo এমন একটি চাল দেয়, যেটাকে মানুষ হাস্যকর মনে করেছিলো। কোনো অভিজ্ঞ খেলোয়াড় হলে সাধারণত এমন চাল দিত না। কিন্তু পরে দেখা যায়, সেটাই ছিল অসাধারণ বুদ্ধিমান একটি সিদ্ধান্ত। এই ঘটনায় লি সেদল বুঝতে পারেন, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা শুধু মানুষের মতো খেলছে না, বরং নতুনভাবে চিন্তা করতেও শিখে গেছে। 

লি সেদল পরে বলেছিলেন, সেই একটা চাল তাঁকে এই খেলা সম্পর্কে এমন কিছু শিখিয়েছে যা সারা জীবন খেলেও তিনি জানতেন না। তিন বছর পর তিনি অবসর নিলেন।

কারণ তাঁর মনে হয়েছিল কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যাকে হারানো মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

— — —

২০২২ সালের নভেম্বরে একটা চ্যাটবট ছাড়া হলো ইন্টারনেট দুনিয়ায়। ChatGPT।  মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে এই চ্যাটবটের ব্যবহারকারী সংখ্যা দশ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়, আর দুই মাসের মধ্যে তা পৌঁছে যায় দশ কোটিতে। যা ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া প্রযুক্তিগুলোর একটি। মানুষ এটিকে শুধু তথ্য জানার জন্য নয়, বরং যা ইচ্ছা তাই লেখার জন্য, প্রিয় পোষা প্রাণী হারানোর দুঃখ প্রকাশ করা কিংবা জীবনের একান্ত ব্যাক্তিগত বিষয়াদি নিয়ে কথা বলার মতো বিষয়েও ব্যবহার করতে শুরু করে। কারণ এই কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা এমনভাবে উত্তর দিচ্ছিল, যেন সে অসংখ্য বই, লেখা ও জ্ঞান থেকে শিখে মানুষের ভাষা গভীরভাবে বুঝে ফেলেছে।

আর সে উত্তর দিচ্ছিল। নিখুঁত গদ্যে। শান্ত কিন্তু আত্মবিশ্বাসে। কারণ, এক অর্থে, সে সেকেন্ডে পৃথিবীর সব বই পড়ে ফেলছিল।

— — —

২০২৩ সালের মে মাসে বিশ্বের শীর্ষ AI গবেষক ও প্রযুক্তি নেতারা একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ন চুক্তিতে  স্বাক্ষর করেন। সেখানে তারা বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে মানবজাতির জন্য যে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা মহামারী বা পরমাণু যুদ্ধের মতোই গুরুতর এবং এটিকে বৈশ্বিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো , তারা সরাসরি “বিলুপ্তি” শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা মানব সভ্যতার অস্তিত্বের জন্যও হুমকি হতে পারে। যারা নিজেরাই এই প্রযুক্তি তৈরি করছেন, তাদের নিজেদের মুখে এমন সতর্কবার্তা অবশ্যই আশঙ্খাজনক। 

— — —

এই ঘটনাগুলো সাইন্স ফিকশন নয় আর। একদম বিদঘুটে বাস্তব। 

London এর এক রেডিওলজিস্ট দেখলেন, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা তাঁর চেয়েও বেশি নির্ভুলভাবে প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যান্সার শনাক্ত করতে পারছে। এতে তিনি একদিকে স্বস্তি পান, কারণ এতে মানুষের জীবন বাঁচতে পারে; আবার অন্যদিকে এক ধরনের ভয়ও অনুভব করেন, কারণ নিজের বহু বছরের দক্ষতাকে একটি যন্ত্র ছাড়িয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে Ohio এর এক বৃদ্ধ মোবাইল টেলিফোনে নিজের নাতনির কান্না শুনে কিছু খারাপ মানুষের হাতে টাকা তুলে দেন। পরে জানা যায়, সেই কণ্ঠ কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি।  এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয়, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা শুধু প্রযুক্তিকে বদলাচ্ছে না, এটি মানুষের বিশ্বাস, অনুভূতি আর বাস্তবতা বোঝার ধরনও বদলে দিচ্ছে। “চোখে দেখলেই বিশ্বাস” এই ধারণাটাও ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে।

সবচেয়ে আয়রনি হলো এই যে মানুষেরা এই ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে চিন্তিত, তাঁরাই কিন্তু এটা বানাচ্ছেন। তাঁদের যুক্তি একটাই: যদি এটা আসছেই, তাহলে যাদের সুরক্ষার চিন্তা আছে তারাই বানাক।

বড়ই মহৎ যুক্তি। 

— — —

হয়তো আমরা গল্পটা ভুলভাবে বলছি।

প্রতিটা বড় আবিষ্কারেই এক ধরনের আত্মসমর্পণ ছিল। আমরা বর্শার কাছে নখ আত্মসমর্পণ করেছি। বাতির কাছে রাত।  আর চাকার কাছে দূরত্ব। প্রতিটা আত্মসমর্পণই সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল হারানো। কিন্তু প্রতিটাই পরে একটা দরজা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এখন হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় দরজা। দরজার ওপারে কী আছে, আমরা জানি না। কিন্তু চাবিটা;  এই মুহূর্তে; এখনও আমাদের হাতে।

আজ আমরা প্রযুক্তি আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে যে পৃথিবী তৈরি করছি, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেটাকেই স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে পাবে। তারা হয়তো একদিন ফিরে তাকিয়ে জানতে চাইবে, মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি সম্পর্কে জানত কি না?  তাদের প্রশ্ন হবে, এত কিছু জেনেও মানুষ কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? কীভাবে এই শক্তিকে ব্যবহার করেছিল?  আর কতটা দায়িত্ব নিয়ে ভবিষ্যৎ গড়েছিল? 

Rowshan Taieen
rowshantaieen
Writer & Storyteller

a visual storyteller, built like mini documentaries on the page — across history, culture, diplomacy, mystery, and more.

Leave a comment